সমুদ্রের বুকে জ্বলে ওঠা হাজারো তারা - The News Lion

সমুদ্রের বুকে জ্বলে ওঠা হাজারো তারা

 


দি নিউজ লায়নঃ  রাতের আকাশে আমরা ঝলঝল করা তারকারাজি দেখে অভ্যস্ত। সমুদ্রের বুকেও যে জ্বলে উঠতে পারে রাতের আকাশের মত করেই হাজারো তারকা তা আমরা অনেকেই জানি না। শত-সহস্র বছর ধরে সমুদ্রচারী মানুষ এ বিষয়টিকে নিয়ে তৈরি করেছে নানা জল্পনা-কল্পনা আর রহস্যের ধুম্রজাল। আধুনিককালে আকাশগঙ্গা ছায়াপথ বা মিল্কিওয়ে’র নামানুসারে এর নাম দেয়া হয়েছে “মিল্কি সী । চন্দ্রহীন অন্দকারাচ্ছন্ন রাতে সমুদ্রের বুকে জেগে উঠে এই মিল্কি সী।  


তবে ইতিহাসে সর্বপ্রথম এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে চলে আসে গ্রীক বিজ্ঞানী আনিক্সিনেমেনেস এর নাম। খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ সালে তিনি তার কোনো এক বইতে অদ্ভুত এই ঘটনাটি লিপিবদ্ধ করেন যদিও এর কোনরূপ ব্যাখ্যা তিনি দাঁড় করাতে পারেননি। এরপর হাজার হাজার বছর ধরে এ নিয়ে লোকমুখে তৈরি হয় ভৌতিক সব গল্প। তবে অধুনা বিজ্ঞানের কাছে আর এই রহস্য অধরা নেই। বিজ্ঞানের ব্যাখ্যায় ঘটনাটিকে বলা হয়ে থাকে “Bio-luminescence”; বাংলায় বলা যেতে পারে “জৈব-আলোক”।


   সামুদ্রিক প্রাণীরা তাদের দেহে বিশেষ এক ধরনের জৈবরাসায়নিক ক্রিয়ার মাধ্যমে উৎপন্ন করে এই জৈব-আলোক। বিস্ময়কর হলেও সত্য যে প্রায় নব্বই ভাগ সামুদ্রিক প্রানিরই এই আলো উৎপাদনের ক্ষমতা আছে। সমুদ্রের যেকোনো গভীরতায়ই জৈব-আলোকের দেখা মিললেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা ঘটে অন্ধকারাচ্ছন্ন রাতে সমুদ্রের উপরিভাগে। তবে দিনের বেলায় জৈব-আলোক দেখতে চাইলে যেতে হবে গভীর সমুদ্রে যেখানে সূর্যের আলো পৌছায় না।


 মূলত চারটি কাজে সামুদ্রিক প্রাণীরা এই আলো ব্যবহার করে থাকেঃ  কৌশলে শত্রু এড়ানো, খাদ্য আকৃষ্টকরন, নিজ প্রজাতির মাঝে যোগাযোগ রক্ষা এবং নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়া।  অধিকাংশ জৈব-আলোকের তরঙ্গদৈর্ঘ্য ৪৪০-৪৭৯ ন্যানোমিটারের মাঝে হওয়ায় তা দৃশ্যমান বর্ণালীর মাঝামাঝি অবস্থানে পড়ে, যার ফলশ্রুতিতে জৈব-আলোক নীল দেখায়।জলে নীল আলোর সরণ সর্বাধিক বিধায় গভীর জল থেকেও এই আলো দৃশ্যমান হয়(একই কারণে জলের নিচের জগৎটা নীল দেখায়)। তবে মজার বিষয় হল অধিকাংশ সামুদ্রিক প্রাণীর দৃষ্টি শুধুমাত্র নীল আলোতেই সংবেদী। 


নীল আলোর চেয়ে বেশি বা কম তরঙ্গদৈঘের আলো শোষণকারী বর্ণকণিকা এদের মাঝে অনুপস্থিত। তবে নিডারিয়া পর্বের কিছু প্রাণী সবুজ আলোর বিচ্ছুরণ ঘটাতে সক্ষম। মেলাকসটিড গোত্রের কিছু প্রাণী লাল আলোর বিচ্ছুরণ ঘটাতে ও দেখতে সক্ষম, যদিও এই লাল আলো অবলোহিত ধরণের হওয়ায় তা মানুষের ও অন্যান্য প্রাণীর দৃষ্টিগোচর হয় না। আর এই বিষয়টিই তাদেরকে শিকার ধরতে সাহায্য করে। অবলোহিত রশ্মির দ্বারা এরা এদের শিকারকে দেখতে পেলেও এদের শিকার ঘুণাক্ষরেও ওঁত পেতে থাকা শত্রুটির উপস্থিতি টের পায় না। 


 বহুকোষী প্রাণীতে জৈব-আলোক উৎপাদন নিয়ন্ত্রিত হয় স্নায়ুকোষের মাধ্যমে। কিছু কিছু প্রাণী নিরবচ্ছিন্নভাবে আলো তৈরি করতে পারলেও অধিকাংশরাই তৈরি করে আলোর ঝলকানি যেগুলোর স্থায়িত্ব ০.১ সেকেন্ড বা এরও কম।  এখন পর্যন্ত জৈব-আলোক উৎপাদনের দুই ধরনের মাধ্যম খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। কিছু প্রাণী তাদের দেহের ফটোফোর নামক এক বিশেষ ধরণের কোষ থেকে জৈব-আলোক তৈরি করে (যেমনঃ অ্যাঙ্গলার মাছ)। 


অন্যদিকে কিছু প্রাণীর দেহে বিশেষ এক ধরণের ব্যাকটেরিয়া বাস করে করে যারা জৈব-আলোক তৈরি করে থাকে। তবে জৈব-আলোক ফটোফোর কিংবা ব্যাকটেরিয়া যে মাধ্যমেই তৈরি হোক না কেন রাসায়নিকভাবে এর উৎপাদন কৌশল সবক্ষেত্রে একই। রাসায়নিক এই প্রক্রিয়াটি সংঘটিত হয় অক্সিজেনের উপস্থিতিতে। আর এর জন্য প্রয়োজনীয় দুটি রাসায়নিক উপাদান হল- লুসিফেরিন (পিগমেন্ট) এবং লুসিফিরেজ (এনজাইম)।

কোন মন্তব্য নেই

Thankyou To Comment us

Blogger দ্বারা পরিচালিত.